তিন তরুণ প্রকৌশলীর রেললাইন নিরাপত্তা

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রেল পরিবহন। টানা হরতাল এবং অবরোধে রেললাইনের বিভিন্ন স্থানে স্লিপার তুলে ফেলে রেললাইন অকার্যকর করা হয়ে উঠেছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। দেশের বিস্তৃত প্রায় সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার রেলপথে পুলিশ পাহারা বসিয়ে এ ধরনের নাশকতা রোধ করার চিন্তাটা অনেকটাই অবাস্তব। এর বাইরে রেল কর্তৃপক্ষের কাছে এমন কোনো প্রযুক্তি নেই, যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে জানা সম্ভব রেললাইনের কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না। ঠিক এই ধরনের একটি পরিস্থিতিতেই রেলপথ কী করে সুরক্ষিত রাখা যায়, তেমন চিন্তা থেকেই একদল তরুণ উদ্ভাবন করেছে এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবেই জানা সম্ভব রেল লাইনের কোনো অংশে স্লিপার অপসারিত হয়েছে কি না।

এই উদ্ভাবনের পেছনে যে দলটি কাজ করেছে, তার মধ্যে রয়েছেন মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) প্রাক্তন দুই শিক্ষার্থী আসিফ ইকবাল রাতুল ও ইসতাকুর রহমান এবং সেখানকার বর্তমান শিক্ষার্থী মো. আলভী নূর। রেললাইন অপসারণ শনাক্তকরণ ডিভাইসের এই প্রজেক্টটির নাম তারা দিয়েছে 'প্রজেক্ট সেফলাইন'। প্রজেক্ট সেফলাইন মূলত আরডুইনো-নির্ভর জিএসএম মডিউল সংযুক্ত একটি ডিভাইস। যদি রেললাইনের কোন স্লিপার অপসারিত হয় তবে এটি সাথে সাথে তা শনাক্ত করতে পারে এবং ঠিক কোথায় স্লিপারটি অপসারিত হয়েছে তার অবস্থান এসএমএস-এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থা এবং স্টেশনে সাথে সাথেই জানিয়ে দিতে সক্ষম হবে।

প্রজেক্ট সেফলাইন কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে জানতে চাইলে আসিফ ইকবাল রাতুল বলেন, 'পুরো সিস্টেমটি মূলত কাজ করে ক্লোজ-লুপ সিস্টেমে লুপ-কারেন্ট ব্যাবহার করে। এখানে পরিপূর্ণ রেললাইনটি একটি ক্লোজ-সার্কিট হিসেবে কাজ করে। রেললাইনের কোনো স্লিপার অপসারিত হলে রেললাইনটি ওপেন-সার্কিটে পরিণত হয় এবং সিস্টেমের আরডুইনো বোর্ড তা নির্ণয় করে। এরপরই নির্দিষ্ট জোনের আরডুইনো বোর্ডটি ওই জোনের 'রেললাইন স্লিপার অপসারিত হয়েছে' এমন একটি সতর্কীকরণ বার্তাসহ পূর্বনির্ধারিত মোবাইল নম্বরসমূহে এসএমএস পাঠানোর জন্য জিএসএম মডিউলকে নির্দেশ দিবে। সাথে সাথেই জিএসএম মডিউল মোবাইল নম্বরসমূহে এসএমএস পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেবে। এইভাবে তিন মিনিট অন্তর অন্তর সিস্টেমটি রেললাইন ওপেন কি না তা পরীক্ষা করে এবং এসএমএস পাঠাতে থাকে। ফলে সার্বক্ষণিকভাবেই মনিটর করা সম্ভব হয় রেললাইনের কোনো স্থানে কোনো সমস্যা রয়েছে কি না।'
রাতুল জানান, প্রজেক্ট সেফলাইনের সিস্টেমটি তৈরির পর তারা একটি 'ডামি রেললাইন' তৈরি করে পুরো সিস্টেমের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন এবং তাতে সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়া যায়। বাংলাদেশে রেল স্টেশনগুলোর দূরত্ব একটি থেকে অন্যটি বেশি না হওয়ায় প্রাথমিকভাবে প্রতিটি স্টেশনে একটি করে মডিউল বসালেই গোটা দেশের পুরো রেলপথ একটিমাত্র নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব বলে জানান তিনি। তবে রেল স্টেশনগুলোর মধ্যেকার দূরত্ব ৫ কিলোমিটারের বেশি হলে এর মধ্যবর্তী স্থানে বাড়তি মডিউল স্থাপন করতে হবে বলে জানান তিনি। কেবল নাশকতাই নয়, যেকোনো দুর্ঘটনার কারণে স্লিপার অপসারিত হওয়ার ঘটনা এই সিস্টেমের মাধ্যমে সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব জানিয়ে প্রজেক্টের আরেক সদস্য ইসতাকুর রহমান বলেন, 'এই সিস্টেমটি সারাদেশের রেললাইনকে নিরাপদ রাখতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম। আর এই সিস্টেম স্থাপন এবং রক্ষণাবেক্ষণও খুব বেশি ব্যয়বহুল নয়। তাই রেল কর্তৃপক্ষ এই ডিভাইসগুলোকে স্থাপন করলে তা সার্বিকভাবে রেললাইনের নিরাপত্তায় একটি মাইলফলক হিসেবেই গণ্য হবে।'
এই প্রজেক্টের তিন সদস্যের পড়ালেখাই অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। নিজেদের পড়ালেখার পাশাপাশি নানা ধরনের প্রজেক্ট নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটে তাদের। রেললাইন নিরাপদ রাখার এই প্রজেক্টটি তারা সম্পূর্ণ নিজেদের খরচেই করেছেন দেশের নিরাপত্তার স্বার্থেই। ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত আরও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্রত নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন তারা। সারাবিশ্ব যেভাবে প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশও যে পিছিয়ে নেই, সেটি প্রমাণ করাও তাদের অন্যতম লক্ষ্য। প্রাতিষ্ঠানিক এবং আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশকে আরও এমন অনেক উদ্ভাবনে উদ্ভাসিত করতে পারবেন বলে আত্মবিশ্বাসী এই তরুণদল। সুত্র: http://www.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDNfMTJfMTRfNF80MV8xXzExNTEwMQ%3D%3D

 

 

 

 

 

 

 

ট্যাগ