পানির নিচে রাস্তা ভাল

তিলোত্তমা নগর

আমাদের প্রিয়তম ঢাকা

 বৃষ্টিস্নাত শহর

জলের নিচে গাড়ির চাকা

ঢাকার রাস্তা এখন আর চোখে পড়ে না, সবই যেন জলঢাকা। মানে জলে ঢাকা। যেদিকে তাকায় শুধু জল আর জল। জলের আবার অনেক রকমফের। বৃষ্টির জল, নর্দমার জল, সুয়ারেজ লাইনের জল আরও কত কি! আর সেই জলে নাকানিচুবানি খাচ্ছেন ঢাকার বর্তমান দুই মেয়র আনিস ও সাইদ ভাই। জলাবদ্ধতার জন্য কেউ কেউ আবার ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’ এর মত বর্তমান সরকারের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে বেজায় খুশি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ঢাকার রাস্তায় এখন প্রাইভেট গাড়ির সাথে সাথে প্রাইভেট নৌকা চালাবে মানুষ। চট্টগ্রামের এক সরকারি অফিসের কর্মকর্তারা তো আরেক কাঠি সরেস। তাঁরা একবারে নৌকা কিনেই ছেড়েছে চলাচলের জন্য।

 

আসলে দোষ কার সে সব তর্কে না জড়ানোয় ভাল হবে এই অধমের। কারণ দোষ যদি কারো থেকেই থাকে তাহলে আসামীর কাঠগড়ায় আমরা সবাই থাকব। শুধু একা সরকার নয়। জলাবদ্ধতা, জলমগ্নতা, যানজট বা পাহাড়ধসের মত ঘটনা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে যে শুধু প্যারাসিটামল দু’বেলা খেলে রোগ সারবে বলে মনে হয় না। বরং রোগটাকে যথাযথ ভাবে ভিতর থেকে চিহ্নিত করে রোগ সারাবার সময় এখন এসে গিয়েছে।

 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে দীর্ঘ এক যুগ বাংলাদেশে নির্মাণশিল্পে প্রকৌশলী হিসাবে কাজ করেছি। দেশ বিদেশের অনেক প্রকৌশলীর সাথে কাজ করবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কাজ করতে গিয়ে ভুল শুদ্ধ যা শিখেছি তা সবই একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ব্লগ www.need4engineer.com লিখে গিয়েছি। যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে উন্নত জগত গঠন (আই,ই,বি এর শ্লোগান) করতে পারে। বর্তমানে অষ্ট্রেলিয়ার মত প্রথম সারির দেশে এসেও নির্মানশিল্পে প্রকৌশলী হিসাবে কাজ করে চলেছি। এতে করে বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞানের সম্মিলনে রঙ্গিন হচ্ছে মনের ক্যানভাস। সেই জায়গা থেকে দু’একটি ধারণা সবার সাথে ভাগ করে নিতে চাই। তাতে সমস্যার সমাধান রাতারাতি হবে এমনটি নয়। বরং এই ধারণাগুলো নিয়ে দেশ বান্ধব বা পরিবেশ সহনশীল পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির প্রয়োগ করা যেতে পারে।  

 

১) বাংলাদেশে কয়েক দিন ধরেই রেইন ওয়াটার হারভেষ্টিং ট্যাঙ্কের  কথা বেশ শোনা যাচ্ছে। এটি বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে আসা খুবই প্রয়োজন।  শুধু জলাবদ্ধতা দূরীকরণই নয় বরং ভূ-গর্ভস্তরে পানির স্তর ঠিক রাখার জন্যও এটির দরকার। কারণ প্রতিদিন হাজার হাজার গ্যালন পানি ঢাকা ওয়াসা ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করে ঢাকাবাসির পানির চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে। মাটির নিচে পানির স্তর বেশি নেমে গেলে ভূমিকম্প বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগে ঢাকার শহরের ভূমি দেবে যাবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অষ্ট্রেলিয়ায় কাজ করতে গিয়ে দেখেছি একটি ভবনের প্ল্যান পাশ করবার সময় অন সাইট ষ্টর্ম ওয়াটার ডিটেনশন ট্যাঙ্কের (রেইন ওয়াটার হারভেষ্টিং ট্যাঙ্কের মত) নকশা সরকারী সংস্থায় জমা দিতে হয়। অষ্ট্রেলিয়ার প্রকৌশলীরা হিসাব করেন, যে ভূমিতে ভবন নির্মাণ করা হবে সেই ভূমি টি তো এখন সবুজ মাঠ, এই অবস্থায় যদি সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয় (ওই অঞ্চলের ১০০ বছরের সর্বোচ্চ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত ও সর্বোচ্চ সময় ধরে বৃষ্টিপাতের তথ্য ব্যবহার করা হয়) তাহলে সেই পানির কত শতাংশ ওই সবুজ ভূমি শুষে নিবে আর কত শতাংশ পানি বর্তমান ড্রেনেজ ব্যবস্থায় যাবে। এখন ওই ভূমি তে ভবন নির্মাণ করা হলে বৃষ্টির সম্পূর্ণ পানিই ড্রেনেজ ব্যবস্থায় চলে যাবে, বৃষ্টির পানির কোনো অংশই মাটি শুষে নেবার সুযোগ পাবে না। ফলে বর্তমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়বে। এভাবে একের পর এক খালি জমিতে বাড়ী নির্মাণ করা হলে তো আর রক্ষা নেই। অল্প বৃষ্টিতেই ড্রেনের পানি উপচিয়ে রাস্তায় চলে আসবে, সৃষ্টি হবে জলমগ্নতা। সে কারণেই ভবনের নির্মাণের সময় মাটির নিচে অন সাইট ষ্টর্ম ওয়াটার ডিটেনশন ট্যাঙ্কের প্রচলন হয়েছে। অর্থ্যাৎ বৃষ্টির সময় যে পানিটুকু মাটি শুষে নিত সেই পানি কিছু সময়ের জন্য এই ট্যাঙ্কে ধরে রাখা হয়। এই পানি দিয়ে টয়লেট ফ্ল্যাশ, গাছে পানি দেয়া, গাড়ি ধোয়া এমনকি বড় বড় ভবনের এসির কুলিং টাওয়ারেও ব্যবহার করা যায়। অনেকে বলেন বৃষ্টির পানি পান করবারও উপযুক্ত। দৈনন্দিন এই সব পানির চাহিদা মিটিয়ে অন সাইট ষ্টর্ম ওয়াটার ডিটেনশন ট্যাঙ্কের  অতিরিক্ত পানি যখন বৃষ্টিপাত থাকে না বা ড্রেনেজ ব্যবস্থার পানি নিষ্কাশন হয়ে গিয়েছে বোঝা গেলে পাম্প করে ড্রেনেজ ব্যবস্থায় দেওয়া যেতে পারে।

 

অনেকে হয়ত বলবেন, এতে করে আমার জায়গা নষ্ট হচ্ছে বা আমার বাড়ি বানাতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। প্রকৌশলী হিসাবে এতটুকু বলতে পারি এই ট্যাঙ্কের খরচ পুরো বাড়ি বানানোর খরচের সামান্য অংশ। আমরা এমনিতেই মাটির নিচে খাবার পানি সংরক্ষণের জন্য ট্যাঙ্ক ও সেপটিক ট্যাঙ্ক বানিয়ে থাকি। সমাজ বা দেশের স্বার্থে আরেকটি ট্যাঙ্ক না হয় বানালাম। রবীন্দ্রনাথ খুব সুন্দর করে বলেছেন,

ছোট ছোট বালু কণা, বিন্দু বিন্দু জল,

 গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল”

শুধু সরকার নয়, সবার মিলিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাই পারে এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে।

 

২) এতো গেল বৃষ্টির পানি রাস্তায় যাতে না আসে বা জলমগ্নতা থেকে মুক্তির উপায়ের একটি ধারণা। কিন্তু জলাবদ্ধতার দূরীকরণের কি হবে? অর্থ্যাৎ রাস্তা বা ড্রেনে পানির প্রবেশ হয়ত কমে গেল কিন্তু বৃষ্টির কারণে পানি রাস্তা থেকে দ্রুত নিষ্কাশনের কি উপায়। সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কাজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি একটি শিক্ষা আমরা সবাই জেনেছি। সেটি হল, প্রকৃতিকে বশে রেখে অবকাঠামো বা ভবন, রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করতে হয়, প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে নয়। কারণ প্রকৃতির বা পরিবেশের ক্ষতি করলে প্রকৃতি খুব ধীরে ধীরে কিন্তু খুব বড় ধরণের প্রতিশোধ নেয়। তখন কিছু করার থাকে না।

 

এক্ষেত্রে বলবো হাজার হাজার বছর ধরে প্রাকৃতিক ভাবে ভূমিতে যে ঢাল (Natural Slope) তৈরি হয়েছে সেটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া। এর মাধ্যমে পানি তার নিজ ধর্মগুণে উচু স্থান থেকে নীচু স্থান যেমন নদী, নালা, খাল, বিলে চলে আসবে। বর্তমানে বাড়ি ঘর বা অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কারণে অনেকসময় সেই প্রাকৃতিক ঢাল আমরা নষ্ট করে ফেলি। এছাড়া খাল ভরাট করা,খাল দখল করে বাড়ি বা রিসোর্ট নির্মাণ তো আছেই। অর্থ্যাৎ পানি নেমে যাবার জায়গাটিকে ও প্রাকৃতিক ঢাল কে খুব যত্ন করে নষ্ট করা হচ্ছে সরকারের নাকের ডগায়। যার কারণে বৃষ্টির পানি রাস্তা থেকে সরে যাবার স্বাভাবিক গতিপথ হারাচ্ছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার। সরকারের দ্বায়িত্ব হচ্ছে হারানো খাল পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া।

 

এখানেই শেষ নয় কিছু সংখ্যক অসৎ ব্যাক্তিবর্গ পাহাড় কেটে সমতল করে বাড়ি বানানোর অপচেষ্টা করে চলেছেন প্রতি নিয়ত। এতে করে প্রায় প্রতি বছরই বর্ষার সময় পাহাড়ধসে লাশের পাহাড় গড়ে ওঠে আমাদের সামনে। শুধু অষ্ট্রেলিয়া নয় পার্শবর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল, নেপাল বা ভুটান বেড়াবার সময় দেখেছি পাহাড়ে প্রাকৃতিক ঢাল রক্ষা করে কী সুন্দর সুন্দর বাড়ি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। আর সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ তো খুব চমৎকার সমতল ভূমি। এখানে প্রাকৃতিক ঢাল রক্ষা করা আরও সহজ।

 

৩) বৃষ্টির পানি রাস্তা দিয়ে তো শুধু খাল বিলে যায় না, ড্রেন দিয়েযায় বেশিরভাগ। পরিচ্ছন্ন কর্মীরা যখন ড্রেন পরিষ্কার করেন তখন দেখা যায় প্রচুর চিপসের প্যাকেট,প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন বা অন্যান্য অপচণশীল আবর্জনা দিয়ে ড্রেন বন্ধ থাকে। এটি কিন্তু পুরোটায় আমাদের মানসিক রুগ্নতার লক্ষণ। সরকার এখানে একেবারেই দায়ী নয়। কিছুদিন আগে আনিসুল হক মেয়র হওয়ার পর ফুটপাতের উপর কিছু ধাতব ডাষ্টবিন বসিয়েছিল সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু হায় সেটি কেও ধ্বংস করেছি আমরা আমজনতা। ডাষ্টবিন রক্ষা করবার মানসিকতা গড়ে না উঠলে ডাষ্টবিনে ময়লা ফেলার মানসিকতা গড়ে উঠবে কিভাবে।

 

সেক্ষেত্রে এমন একটি ড্রেনেজ সিস্টেম প্রণয়ন করতে প্রকৌশলীদের যাতে রাস্তাকোন ময়লা ড্রেনের ভিতর প্রবেশ করে ড্রেন বন্ধ করতে না পারে।

 

৪) অনেক তত্ত্ব নিয়ে কপচাকপচি করেছি। এইবার একটি গল্প বলে শেষ করি। এক ভদ্রলোক বিয়ে করবেন। বিয়ের দিন বরযাত্রার আগে ভদ্রলোক দেখলেন তাঁর অমন সাধের সালোয়ারটি দুই ইঞ্চি বড় হয়েছে। তাই তিনি ড্রয়িংরুমে গিয়ে বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের কে সালোয়ারটি দুই ইঞ্চি ছোট করতে বলে বাথরুমে ঢুকলেন। বাড়ির এই ছেলেটির মেজাজ সবাই জানে। তাই কালবিলম্ব না করে ভদ্রলোকের মা, ছোট বোন, ভাবী আলাদা আলাদা ভাবে সালোয়ারটি দুই ইঞ্চি করে ছোট করলেন। ফলে যা হওয়ার তাই হলো, দুই ইঞ্চি বড় হওয়ার বদলে এখন সালোয়ারটি চার ইঞ্চি ছোট হয়ে গিয়েছে। ভদ্রলোকের তো মেজাজ সেইরকম খারাপ। কী আর করা তিনি পাঞ্জাবীর পকেটে হাত ঢুকিয়ে পায়চারী করছেন । পাঞ্জাবীর পকেটে হাত দিতেই একটি কাগজ হাতে পড়ল। তাতে দর্জির লেখা সবসময় সমন্বয় করে কাজ করবেন। সমন্বয়হীনতা অনিষ্ঠের মূল।

 

আমাদের দেশে নানান সরকারী প্রকৌশল সংস্থা রয়েছে – তাদের কাজের একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র আছে। তাতে কোন সমস্যা নেই। সমস্যা হলো শুধু সমন্বয়হীনতায় একই রাস্তা যখন বারে বারে খোড়া খুড়ি চলতেই থাকে। শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যে সমন্বয় থাকলেই একটি অঞ্চলে পরবর্তি একশ বছরে কতগুলো সুউচ্চ ভবন হবে,কত বাসিন্দা সেই ভবনগুলোতে থাকবে আর তাতে করে ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও রাস্তার উপর কতটুকু চাপ পড়বে বা কী ধরণের সমস্যা হবে বা সমস্যা হলে তার সমাধান বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীগন ও অন্যান্য কর্মকর্তারা এক টেবিলেই করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে উন্নত নাগরিক সুবিধা প্রতিটি ব্যক্তি পেতে পারেন। আর সেটি না হলে জাতীয় পত্রিকার প্রথম পাতায় বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে “পানির নিচে রাস্তা ভাল” ছবিটি দেখতে হবে বৃষ্টি হলেই।  

 

পরিশেষে এতটুকু বলতে পারি, জলাবদ্ধতা একটি প্রকৌশলগত সমস্যা। এর সমাধান প্রকৌশলীদেরকে করতে হবে। আমাদের দেশে অনেক বড় বড় নামকরা দেশবরেণ্য কিংবদন্তিতুল্য প্রকৌশলী রয়েছেন। সেই সমস্ত নবীন ও প্রবীন প্রকৌশলীদের নিয়ে (আবারও বলছি শুধুমাত্র প্রকৌশলীদের নিয়ে) জাতীয় কমিটি গঠণ এই সমস্যা থেকে মুক্তি দেবে বলে আমার বিশ্বাস। আর সেই সাথে দরকার আমাদের মত সাধারণ মানুষের শুধু একটু সচেতনতা।