পানির স্তর ও সিপেজ চাপ নিয়ন্ত্রণ

 

অনেকেই বলে থাকেন মাটির ভেতর যদি পানি না থাকত তাহলে সয়েল মেকানিক্স বিষয়টি পড়বার দরকার পড়তো না। দেখা যায় মাটির ধারণ ক্ষমতা,  সেটেলমেন্ট, সিপেজ, পাইল ডিজাইন ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে পানি একটি মুখ্য ভূমিকা রাখে। আসলেই কি তবে মাটির ভেতরকার পানি প্রকৌশলীদের বিরক্তির কারণ? মাটির মধ্যে পানি না থাকলেই ভাল হতো? এ প্রশ্ন অবান্তর। কারণ পানির অপর নাম জীবন। পানি না থাকলে গাছ-পালা, শষ্য, প্রাণীজীবন কিছুই বেচে থাকত না। তাই মাটির ভেতর পানি থাকবেই আর সেই পানি কে আমলে নিয়ে বা নিয়ন্ত্রণ করাই প্রকৌশলীদের কাজ।

 

ঢাকা শহরে এখন মাটির নিচে একতলা থেকে শুরু করে পাচ তলা ভবন পর্যন্ত নির্মিত হচ্ছে যাকে বেজমেন্ট বলা হয়। বেজমেন্ট নির্মাণের সময় যখন মাটি কেটে গর্ত বানানো হয় তখন দেখা যায় মাটির চারপাশ থেকে এমন কি নিচ থেকেও পানি চুইয়ে চুইয়ে আসছে। এই পানি চুইয়ে আসা কে প্রকৌশলবিদ্যায় সিপেজ বলে। ঢাকার মাটির রিপোর্টে দেখা যায় যে প্রায় ১৫-২৫ ফুট পর্যন্ত লাল এটেল মাটি বা ক্লে সয়েল পাওয়া যায় এরপর আরও  ২০-৩০ ফুট বালি মাটি বা স্যান্ডি সয়েল পাওয়া যায়। বালি মাটির মধ্যে পানি থাকলে তার সিয়ার স্ট্রেন্থ থাকেনা এ অবস্থা কে লিকুইফ্যাকশন বলা হয়। অনেক সময় দেখা যায় মাটি প্রোটেকশনের জন্য যে শোর পাইল করা হয় তার ফাক দিয়ে বালি সহ পানি বেজমেন্টের জন্য তৈরি করা গর্তের মধ্যে চলে আসে। যার ফলে আশেপাশের রাস্তা বা ভবনের নিচ থেকে যদি মাটি সরে যায় তাহলে ঐ রাস্তা বা ভবনের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। এছাড়াও প্রকল্পের ভিতর পানি আসলে প্রকল্পের কাজেও বেশ সমস্যা হয় যেমনঃ কাদামাটির ভেতর ঢালাই করলে ঢালাই এর কোয়ালিটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, প্রকল্পের ভেতর মাটি ভেঙ্গে আসে, শ্রমিকদের হাটাচলা অসুবিধা, ভেজা মাটির মধ্যে কাজ করার জন্য নিরাপত্তাজনিত ও অসুস্থতাজনিত সমস্যা দেখা দেয়। তাই প্রকৌশলীদের সিপেজ এবং মাটির মধ্যে পানির স্তর নিয়ন্ত্রন করার প্রয়োজন হয়।

 

সিপেজ পানির প্রবাহ সাধারণত দুই রকমের হয়ে থাকে একটিকে বলা হয় আর্টেসিয়ান প্রবাহ আর অপরটিকে গ্রাভিটি প্রবাহ। যদি বালি মাটির উপরে ও নিচে এটেলমাটি বা শিলা থাকে তাহলে পানি প্রবাহ সাধারণত সেদিকেই হতে থাকবে যেদিকে মাটি বা পানি চাপ কম হবে এই ধরণের প্রবাহ কে আর্টেসিয়ান প্রবাহ বলে। এই প্রবাহে পানির চাপ বেশি থাকে। অনেকসময় ভিত্তি তলের জন্য নির্মিত লীন কঙ্ক্রীট ভেংগে পানি ভিত্তি তলের উপরে চলে আসে। অপরদিকে, কোনো জায়গায় যদি গর্ত খোড়া হয় আর পানির স্তর যদি ঐ গর্তের তলের উপরে থেকে তখন উচ্চতার পার্থক্যের জন্য এবং মাধ্যাকর্ষণজনিত কারণে পানি গর্তের গা বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়তে থাকে এই ধরণের প্রবাহ কে গ্রাভিটি প্রবাহ বলে। এই প্রবাহের কারণে বালি মাটিসহ পানি গর্তের মধ্যে আসতে থাকে। এই প্রবাহ কে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভয়াবহ দুর্ঘটনার সৃষ্টি হতে পারে। নিচে পানির স্তর এবং সিপেজ নিয়ন্ত্রনের কয়েকটি উপায় নিয়ে আলোচনা করা হলোঃ

 

 

 

১) ভিত্তি তল বা ফাউন্ডেশন লেভেলের নিচে ছোট গর্ত করাঃ  যদি প্রকল্পের আকার ছোট হয় এবং একটা বা দুইটা বেজমেন্ট হয় তাহলে এই পদ্ধতি বেশ কাজ করে। এখানে প্রকল্পের মাটি অপসারণের সময় ভিত্তি তলের চারপাশ দিয়ে ছোট নালা করা হয় এবং এই নালাগুলো বিভিন্ন জায়গায় তৈরি করা কয়েকটি ছোট ছোট গর্তের সাথে সংযোজিত করা হয়। ফলে পানি সবসময় একটি নির্দিষ্ট পথে চালিত হবে, গর্তের মধ্যে জমা হবে। পরে পাম্প দিয়ে পানিকে প্রকল্পের বাইরে নিয়ে যাওয়া যাবে। এতে করে পানি ভিত্তি তলের উপরে আসতে পারবেনা এবং ভিত্তি তল শুকনা থাকবে।      

 

২) প্রকল্পের চারপাশে নলকুপ বসানোঃ যদি প্রকল্পের আকার মাঝারি হয় এবং দুইটা বা তিনটা বেজমেন্ট থাকে তাহলে প্রকল্প শুরু করার প্রায় তিন-চার মাস আগে থেকে শোর পাইলের বাইরে ১০-২০ ফুট দূরে দূরে কিছু নলকুপ বসানো যায়। ৩/৪ টি নলকুপের রাইজার পাইপ একত্র করে তার সাথে পাম্প লাগিয়ে সার্বক্ষনিকভাবে পানি উত্তোলন করা যায়। এতে করে ওই প্রকল্পের চারপাশে পানির স্তর ভিত্তি তলের নিচে নেমে যেতে থাকে। ফলে সিপেজ পানির চাপ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

 

৩) প্রকল্পের চারপাশে গভীর কুপ খননঃ যদি প্রকল্পের আকার বড় হয় এবং তিনটি বা তার অধিক বেজমেন্ট থাকে তখন প্রকল্প শুরুর ৬/৭ মাস আগে থেকে প্রস্তুত হতে হবে সিপেজ পানি নিয়ন্ত্রন নিয়ে। প্রকল্পের চারপাশে খালি জায়গায় শোর পাইলের বাইরে বড় বড় গভীর কুপ খনন করা প্রয়োজন এবং এই কুপগুলি থেকে সাবমারসিবল পাম্প দিয়ে পানি লাগাতার ভাবে উত্তোলন করতে হবে। যাতে করে প্রকল্পের আশেপাশের সমস্ত এলাকা জুড়ে পানির স্তর ভিত্তি তলের নিচে থাকে। পুনরায় মাটি পরীক্ষা করে পানির স্তর সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে প্রকল্পের মাটি কাটা শুরু করতে হবে।

 

পানির স্তর নিচে নামিয়ে আনা বা সিপেজ পানির চাপ নিয়ন্ত্রন করতে পারলে প্রকল্পের অনেক ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।