বালি, পর্ব -১

ফাইন এগ্রিগেট হিসাবে কংক্রিট, প্লাস্টার ও গাঁথুনির কাজে বালি বহুল পরিমাণে ব্যবহার হয়ে থাকে। বিভিন্ন দানার বালি আমাদের দেশে পাওয়া যায়। সঠিক শক্তি পেতে বালি সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা থাকা একান্ত প্রয়োজন। এ অধ্যায়ে বালি সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

বালি

বালি সিলিকার একটি বিশেষরূপ। কোয়ার্টজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণাই বালি হিসেবে পরিচিত। এটি পূরক পদার্থ হিসেবে কংক্রিট ও মসলায় ব্যবহৃত হয়। প্লিন্থ ভরাট, সোলিং এ, বিটুমিনাস রাস্তার সিল কোটে, নিচু জমি ভরাট প্রভৃতি কাজেও বালি ব্যবহৃত হয়।

বালির উৎস

নদীগর্ভ বা সমূদ্রতীর থেকে প্রাকৃতিক বালি সংগ্রহ করা হয়। স্থান বিশেষে গর্ত খনন করে বালি সংগ্রহ করা হয়। উৎকৃষ্টমানের বালি পাওয়া না গেলে সেতু, বাঁধ প্রভৃতি বৃহৎ কাঠামোর জন্য পাথর বিচূর্ণ করে কৃত্রিম বালি তৈরী করা হয়।

প্রাকৃতিক বালি তিন প্রকার। যথা-

  1. গর্তের বালি (Pit sand) : এ ধরনের বালি ভূগর্ভে জমা অবস্থায় পাওয়া যায়। মাটিতে গর্ত খনন করে এ বালি উত্তোলন করা হয়। বালি তীক্ষ্ণ কোণাকৃতির ধারালো কণা বিশিষ্ট এবং লবণ জাতীয় পদার্থ মুক্ত। এর রঙ হালকা হলুদ বা বাদামি বর্ণের হয়ে থাকে। এ বালিতে কাদা ও জৈব উপাদান মিশ্রিত থাকতে পারে। এজন্য এ বালি ব্যবহারের পূর্বে পানি দিয়ে ধুয়ে এবং চালুনি দিয়ে চেলে নেয়া ভালো। খুবই উন্নতমানের এ বালিতে ক্ষতিকারক পদার্থ কম থাকায় নির্মাণকাজের জন্য বিশেষ উপযোগী। বিশেষ করে মসলা তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়।
  2. নদীর বালি (River sand) : নদীর তল হতে এ ধরনের বালি সংগ্রহ করা হয়। নদীর বালি অতি সূক্ষ্ম, গোলাকার ও মসৃণ দানা দ্বারা গঠিত। সামান্য পরিমাণ কাদা ও অন্যান্য অপদ্রব্য মিশ্রিত থাকতে পারে। এ জন্য ব্যবহারের পূর্বে পানি দিয়ে ধুয়ে এবং চালুনি দিয়ে চেলে নেয়া ভালো। নদীর বালির রঙ সাদা। যেহেতু নদীর বালি তুলনামূলক বেশি পরিষ্কার থাকে তাই বেশির ভাগ কাজেই এই বালি ব্যবহার হয়ে থাকে। প্লাস্টারের কাজের জন্য এ বালি বিশেষ উপযোগী। তবে মোটা দানার বালি কংক্রিটের কাজেও ব্যবহার করা যায়।
  3. সমুদ্রের বালি (Sea sand) : সমুদ্রের তীরে এ প্রকার বালি পাওয়া যায়। সাদা বর্ণের গোলাকার, মসৃন ও সূক্ষ্ম দানা দ্বারা গঠিত। এ বালিতে সামুদ্রিক লবণ ও জীবাশ্ম মিশ্রিত থাকে বলে বায়ুমন্ডল থেকে জলীয়বাষ্প  শোষণ করে কাঠামোকে স্যাঁতসেঁতে করে এবং পৃষ্ঠদেশে লবণের আবরণ জমা করে কাঠামোর স্থায়িত্ব নষ্ট করে ফেলে। এ সকল কারণে প্রকৌশল কাজে এ বালি ব্যবহৃত হয় না।

বালির শ্রেণিবিভাগ

দানার আকার অনুযায়ী বালিকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায় । যথা: –

  1. চিকন দানার বালি (Fine sand) : এ ধরনের বালি অতি সূক্ষ্ম। ১৬ নং (ASTM) চালুনিতে (সাইজ ১.১৮ মিমি) চাললে কোন অবশিষ্ট থাকবে না। এ বালি সাধারণত আস্তরের কাজে ব্যবহার করা হয়।
  2. মধ্যম দানার বালি (Medium sand) : ৮ নং (ASTM) চালুনিতে (সাইজ ২.৩৬ মিমি) চাললে কোনো অবশিষ্ট থাকবে না। এ বালি সাধারণত গাঁথুনির মসলায় ব্যবহার করা হয়।
  3. মোটা দানার বালি (Coarse sand) : ৪ নং (ASTM) চালুনিতে (সাইজ ৪.৭৫ মিমি) চাললে কোনো অবশিষ্ট থাকবে না। এ বালি কংক্রিটের ফাইন এগ্রিগেট হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

বালির ভেতর ক্ষতিকারক পদার্থসমূহ

প্রাকৃতিক উৎস হতে প্রাপ্ত বালি বিভিন্ন ক্ষতিকারক অপদ্রব্য (Foreign Materials) মিশ্রিত অবস্থায় পাওয়া যায়। কাদা, পলি, লবণ এবং অন্যান্য জৈব ও অজৈব উপাদান বালিতে মিশ্রিত থাকে। সব বালিতেই কিছু পরিমাণ পলি এবং কাদা থাকে। পলি ও কাদা শতকরা ২ থেকে ৩ ভাগের চেয়ে বেশি হতে পারবে না। বালিতে কোনো ঘাস, পাতা, খড় ইত্যাদি অজৈব পদার্থ থাকা উচিত নয়। বালিতে মিশ্রিত কয়লাও বেশ ক্ষতিকর, কারণ এরা কংক্রিটের লোহায় মরিচা পড়তে সহায়তা করে।

নিচে বালিতে বিদ্যমান ক্ষতিকারক কিছু উপাদানের পরীক্ষা করার উপায় বর্ণনা করা হলোঃ

  1. পলিকণা : একটি কাঁচের বোতলে পরিষ্কার পানি নেই। এই পানিতে কিছু পরিমাণ বালি মিশিয়ে উত্তমরূপে ঝাঁকিয়ে নিলে দেখা যাবে বোতলের পানি ঘোলা হয়ে গেছে। বোতলটিকে স্থির অবস্থায় ২৪ ঘন্টা রেখে দিলে দেখা যাবে বোতলের নিচের অংশে বালি এবং উপরের অংশে পলি ও কাদা জমা হয়েছে। যদি পলি ও কাদার পরিমাণ সর্বোচ্চ ২% হতে ৩% এর মধ্যে থাকে তবে বোঝা যাবে এ বালি নির্মাণ কাজের জন্য উপযোগী। পলি ও কাদার পরিমাণ বেশী হলে বালি ধুয়ে কাদা অপসারিত করে নির্মাণকাজে ব্যবহার করতে হবে।
  2. জৈব পদার্থের উপস্থিতি : একটি কাঁচের বোতলে নমুনা বালি নেই। ৩% পরিমাণ কস্টিক সোডার দ্রবণ ঢেলে দিয়ে বোতলটির মুখ বন্ধ করে দেই। অতঃপর বোতলটিকে ভালোভাবে ঝাঁকিয়ে বোতলটির মুখ বন্ধ করে ২৪ ঘন্টা রেখে দেই। ২৪ ঘন্টা পর পরিবর্তন লক্ষ্য করি। যদি দেখা যায় যে মিশ্রিত দ্রবণটি বর্ণহীন অবস্থায় আছে তবে বোঝা যাবে এতে জৈব পদার্থ নেই। এই বালি ব্যবহারের উপযোগী। যদি দেখা যায় যে দ্রবণে হালকা বাদামি রঙের সৃষ্টি হয়েছে তবে বুঝা যাবে এতে সামান্য পরিমাণ জৈব পদার্থ পদার্থ আছে এবং না ধুয়ে একে নির্মাণকাজে ব্যবহার করা উচিত হবে না। আর যদি দেখা যায় যে দ্রবণে গাঢ় বাদামি রঙের সৃষ্টি হয়েছে তাহলে বোঝা যাবে যে এতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি এবং এ বালি ব্যবহারের একেবারেই অনুপযোগী।
  3. লবণের উপস্থিতি নির্ণয় : বালির স্তূূপ হতে কিছু বালি নিয়ে তার সামান্য অংশ জিহবায় লাগাই। যদি লবণাক্ততা অনুভত হয় তবে বুঝতে হবে বালিতে লবণ আছে। এছাড়া সামান্য বালিতে পানি মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করে পানির স্বাদ জিহবা দ্বারা অনুভব করেও লবণের উপস্থিতি পরীক্ষা করা যায়।

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *