মিজারিং টুলস (Measuring Tools)

কোনো বস্তু বা স্থানের পরিমাপের জন্য যে যন্ত্র ব্যবহার করা হয় তাকে মেজারিং টুলস বলে। যে কোনো কাজের গুণগত মান এর পরিমাপের উপর নির্ভরশীল। পরিমাপে যে কোনো প্রকার ত্রুটি মারাত্মক গোলযোগ সৃষ্টি করতে পারে। সেজন্য পরিমাপ যন্ত্রের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য পরিমাপ যন্ত্রের গঠন ও ব্যবহার সম্পর্কে অধ্যয়ন খুবই প্রয়োজন।

১. কাপড় বা লিলেনের ফিতা: এটি লিলেনের ফিতা দ্বারা তৈরি এক ধরনের পরিমাপ স্কেল। সাধারণত ১৫ বা ২০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৬ মি.মি প্রস্থ হয়ে থাকে। কাপড়ের উপর মিটার, সেন্টিমিটার অথবা ফুট বা ইঞ্চি ইত্যাদির দাগ দেওয়া থাকে। সমগ্র ফিতাটিকে একটি গোল চামড়ার বক্সের মধ্যে গুটিয়ে রাখা হয়। এজন্য বক্সের একটি হাতল থাকে।

চিত্র : কাপড়ের বা লিলেনের ফিতা

ব্যবহার: লম্বা কোনো জায়গা যেমন জমি জরিপ বা বস্তুর মাপ নিতে এটি ব্যবহৃত হয়। কাপড়ের তৈরি বিধায় এ দ্বারা গৃহীত পরিমাপে ভুল বা ত্রুটি থেকে যায়। যেমন কোথাও ভাঁজ পড়ে যেতে পারে।

২. স্টিল টেপ: এটি স্টিলের তৈরি নমনীয় ফিতা এক ধরনের পরিমাপ স্কেল। এর দৈর্ঘ্য ১, ২, ১০, ২০, ৩০ এবং ৫০ মিটার হয়ে থাকে। প্রস্থে ৬-১২ মি.মি। সমগ্র ফিতাটিকে একটি গোলাকার খাপ বা বক্সের মধ্যে গুটিয়ে রাখা যায়। খাপের উপর বোতামের ন্যায় একটি নব থাকে। নবটির উপর চাপ দিলে ফিতাটি স্প্রিং-এর টানে নিজে নিজেই গুটিয়ে আসে। অবশ্য ২ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্য ফিতায় এই সুযোগ নেই। কাপড়ের ফিতা অপেক্ষা স্টিলের ফিতা ব্যবহার বেশি সুবিধাজনক।

চিত্র  : স্টিল টেপ

ব্যবহার: স্টিলের ফিতা বা টেপের উপর ফুট, ইঞ্চি অথবা মিটার সেন্টিমিটার মাপযুক্ত দাগ কাটা থাকে। ফলে এর সাহায্যে সমতল বস্তু বা স্থানের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপা যায়। যেহেতু এটি বেশ নমনীয় তাই বক্র বা অসম উপরিভাগের বস্ত্তর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ পরিমাপ করতেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

৩. মেটাল টেপ: বেশির ভাগ ধাতব ফিতার দৈর্ঘ্য ২০ অথবা ৩০ মিটার হয়ে থাকে। লিলেনের কাপড়ের ফিতার ভিতরে তামার সূক্ষ্ম তার বুনিয়ে এ ফিতা তৈরি করা হয়। কাপড়ের ফিতা অপেক্ষা এতে কিছুটা বেশি সুবিধা পাওয়া যায়। যেমন- কাপড়ের ন্যায় পাক পড়ে না, এটি টানে লম্বা হয় না ইত্যাদি।

চিত্রঃ : মেটাল টেপ

ব্যবহার: বেশির ভাগ ধাতব ফিতার দৈর্ঘ্য ২০ অথবা ৩০ মিটার হয়ে থাকে এবং কাপড়ের বা লিলেনের ফিতার মতোই মাপ নিতে ব্যবহার করা হয়।

৪. স্টিল রুল: অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটির দৈর্ঘ্য ১ ফুট হয় বিধায় একে ফুট রুল বলে। স্টিলের তৈরি তাই বেশ শক্ত এবং দৃঢ়। তাছাড়া মরিচা পড়ার কোনো আংশঙ্কা নেই।

চিত্র  : স্টিল রুল

ব্যবহার: স্টিল রুলের সাহায্যে যে কোনো স্বল্প পরিমাণ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নেওয়া যায়। ইঞ্চি অথবা সেন্টিমিটার উভয় মাপই নেওয়া যায়। তাছাড়া ইঞ্চির ক্ষুদ্র অংশ (১/১৬ ইঞ্চি) এবং মিলিমিটারে মাপ অত্যন্ত সহজেই নেওয়া যায়।

৫. স্টিল ব্যান্ড: এর দৈর্ঘ্য ২০ মিটার বা ৩০ মিটার হয়ে থাকে। পাতলা ইস্পাতের পাতকে একটি আধারে গুটিয়ে রাখা যায়।

চিত্র  : স্টিল ব্যান্ড

ব্যবহার : এর সাহায্যে সার্ভেয়িং বা জরিপের সময় খুবই সূক্ষ্ম মাপ নেওয়া যায়। শিকল অপেক্ষা ওজনে হালকা বিধায় কাজ করতে বেশ সুবিধাজনক। তবে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার না করলে কাজের সময় পাক লেগে যেতে পারে।

৬. জরিপ শিকল: জরিপ কার্যে দৈর্ঘ্যের মাপ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রকার চেইন ব্যবহৃত হয়। যথা :-

ক. প্রকৌশল চেইন;

খ. মেট্রিক চেইন;

গ. গান্টার চেইন।

চিত্র : গান্টার চেইন

ব্যবহার: এটি জরিপ কাজে ব্যবহৃত হয়। এর মোট দৈর্ঘ্য ২২ গজ বা ৬৬ ফুট। সমান ১০০টি লিংকে ভাগ করা থাকে। প্রতিটি লিংকের দৈর্ঘ্য ০.৬৬ ফুট বা ৭.৯২ ইঞ্চি। প্রতি ১০ লিংক পরপর একটি ফুলি লাগানো থাকে। মাইল বা ফার্লং ইত্যাদি দীর্ঘ দূরত্ব পরিমাপে গান্টার চেইনই বেশি সুবিধাজনক।

৭. ফোল্ডিং রুল: এটি বক্স উডের তৈরি। একে চার ভাঁজ করা যায়। দৈর্ঘ্য ২ ফুট। এর মধ্যভাগে একটি কীলক থাকে। কীলক এবং কাঠের রুলের প্রান্ত দুটি পিতল নির্মিত। এই কীলকের সাহায্যে সমগ্র রুলকে দুই ভাঁজ করা যায়। আবার প্রতি ফুট রুলকে ভাঁজ করার জন্য দুইটি কব্জা থাকে।

চিত্র  : ফোল্ডিং রুল

ব্যবহার: নির্মাণ ক্ষেত্রে বিশেষত কাঠের কাজে এর ব্যবহার সর্বাধিক। এই রুল থেকে ফুট, ইঞ্চি অথবা সেন্টিমিটার, মিলিমিটার পরিমাপ গ্রহণ করা যায়। এর সর্বাধিক দৈর্ঘ্য ২ ফুট। বর্তমানে ফুট রুলারের পরিবর্তে মিটার রুলারও পাওয়া যায়।

৮. জিগজাগ রুল: ফোল্ডিং রুলের এটিও বক্স উডের দ্বারা তৈরি। এর দৈর্ঘ্য ১-২ মিটার হয়ে থাকে। এতে অনেকগুলো ভাঁজ থাকে এবং ভাঁজগুলো ফোল্ডিং রুলের ন্যায় শক্তিশালী নয় বিধায় এর ভাঁজ আস্তে আস্তে খোলা হয়।

চিত্র  : জিগজাগ রুল

ব্যবহার: ফোল্ডিং রুলের ব্যবহার জিগজাগ রুলের মতো একই। এর দৈর্ঘ্য ১-২ মিটার হয়ে থাকে। এতে ফোল্ডিং রুলের চেয়ে বেশি দীর্ঘ বস্তুর পরিমাপ নেওয়া যায়।

৯. ট্রাই স্কয়ার: ট্রাই স্কয়ার কাঠের বা স্টিলের স্টক বা হাতল এবং একটি ব্লেড বা ফলক নিয়ে গঠিত। ব্লেডটি ২ থেকে ১২ ইঞ্চি লম্বা হয় এবং আটটি ভাগে দাগ দেওয়া থাকে। দুটি লাইন পরস্পরের সাথে সমকোণে আছে কিনা তা যাচাই বা দুটি লাইনকে সমকোণে আনার জন্য ট্রাই স্কয়ার ব্যবহৃত হয়।

চিত্র  : ট্রাই স্কয়ার

১০. আউট সাইড ক্যালিপার্স:

গোলাকৃতির বা সমতল ঘনববস্তুর বাহিরের পরিমাপের জন্য আউট সাইড ক্যালিপার্স ব্যবহৃত হয়। দুটি বাঁকা লেগ, একটি স্প্রিং ও একটি স্ক্রু নিয়ে এ ক্যালিপার্স গঠিত। এর দুটি লেগ স্প্রিং দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় বিধায় সঠিক ও নির্ভূলভাবে পরিমাপ সম্ভব হয়। ফার্মজয়েন্ট ও ট্রান্সফার নামক দুটি ক্যালিপার্সের ব্যবহারও দেখতে পাওয়া যায়।

চিত্র  : ইন সাইড, আউট সাইড ক্যালিপার্স এবং ডিভাইডার

ব্যবহার: গোলাকৃতির বা সমতল ঘনবস্তুর বাহিরের পরিমাপের জন্য আউট সাইড ক্যালিপার্স ব্যবহৃত হয়।

১১. ইন সাইড ক্যালিপার্স:

স্লট, গোলাকৃতির ছিদ্রের ব্যাস ও চাবি পথের ভিতরের পরিমাপ নেওয়ার জন্য ইন সাইড ক্যালিপার্স ব্যবহৃত হয়। এ ক্যালিপার্সের লেগ বাইরের দিকে বাঁকানো থাকে। তিন প্রকারের ইন সাইড ক্যালিপার্স দেখা যায়। যথা:- ফার্ম জয়েন্ট, স্প্রিং ও ট্রান্সফার।

ব্যবহার: গোলাকৃতির ছিদ্রের ব্যাস ও চাবি পথের ভিতরের পরিমাপ নেওয়ার জন্য ইন সাইড ক্যালিপার্স ব্যবহৃত হয়।

১২. ডিভাইডার:

এর দুটি সুচালো পা আছে। যেগুলোর উপর দিকে রিভিট দ্বারা আটকানো। লোহার তৈরি এ যন্ত্রটি সরল ও বক্র রেখাকে সমান ভাগ করা বা ড্রইং থেকে যে কোনো মাপ নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।

চিত্র  : ডিভাইডার

১৩. মার্কিং গেজ: কাঠের কাজ করার সময় কাঠের পৃষ্ঠের উপর দাগ বা চিহ্ন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। পেন্সিল দিয়ে দাগ মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ অসুবিধা দূর করতে মার্কিং গেজ ব্যবহার করা হয়। এই গেজের চারটি অংশ আছে। যথা:- (ক) বিম (খ) হেড (গ) পিন (ঘ) শাম্ব স্ক্রু। হেডের মধ্যের ছিদ্রে বিমটি অবস্থান করে। হেডকে বিমের উপর দিয়ে ডানে বামে সরানো যায়। বিমের এক প্রান্তে খাড়া পিন থাকে যা দিয়ে কাঠে দাগ কাটা যায়। হেডকে বিমের উপর মাপমতো দূরত্বে আবদ্ধ করে পিন দিয়ে কাঠের পৃষ্ঠে দাগ কাটা হয়। এ দাগ মুছে যায় না।

চিত্র : মার্কিং গেজ

ব্যবহার: কাঠের কাজ করার সময় কাঠের পৃষ্ঠের উপর দাগ বা চিহ্ন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। পেন্সিল দিয়ে দাগ দিলে মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ অসুবিধা দূর করতে মার্কিং গেজ ব্যবহার করা হয়।

১৩. মর্টিজ গেজ:

এটি মার্কিং গেজের মতো। তবে পার্থক্য হলো এতে দুটি পিন থাকে। ফলে একই সেটিং-এ দুটি মাপের দাগ কাটা যায়। পরস্পর নির্দিষ্ট দূরত্বে কোনো দাগের পুনরাবৃত্তি করার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। মর্টিজ ও টেনন জোড় তৈরি করতে মর্টিজ গেজ ব্যবহৃত হয়।

১৫. কম্পাস:

ডিভাইডারের মতো এরও দুটি সুচালো পা রয়েছে। এটি উপরে অংশে সরু ছিদ্রযুক্ত ও বক্রাকৃতির একটি ধাতব পাত লাগানো থাকে যা দ্বারা কম্পাসটি যে কোনো মাপ নিতে পারে। বৃত্ত, অর্ধবৃত্ত ও চাপ আঁকতে, দূরত্ব মাপতে এবং সমদূরত্ব অন্য স্থানে স্থাপন করতে এটি ব্যবহৃত হয়।

 

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *