ঢাকার অর্ধেকের বেশি সড়ক নষ্ট

গত সপ্তাহে টানা বৃষ্টির পর রাজধানীর অধিকাংশ সড়কে হাঁ হয়ে বেরিয়ে এসেছিল বড় বড় গর্ত। গত দুদিনের বৃষ্টির পানি জমে এসব গর্ত আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। বাসের চাকা পর্যন্ত আটকে যাচ্ছে এসব গর্তে। যানবাহনের গতি কমে যাওয়ায় যানজট তৈরি হচ্ছে। তীব্র ঝাঁকুনিতে যাত্রীদের অবস্থা কাহিল।
রাজধানীর প্রধান সড়ক কিংবা গলিপথ—প্রায় সবখানেই এখন এই অবস্থা, চলাচলে স্বস্তি নেই। পাঁচটি মূল সড়কের চারটিতেই চলাচলের জন্য কষ্ট। সব মিলিয়ে রাজধানীর প্রায় ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার সড়কের অর্ধেকের বেশিই এখন বেহাল।
গত মঙ্গল ও বুধবার এসব সড়ক ঘুরে এবং সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে। এই পরিস্থিতির জন্য নগরবিদ ও প্রকৌশলীরা অপরিকল্পিত ও নিম্নমানের রক্ষণাবেক্ষণকে দায়ী করেছেন। তাঁরা বলছেন, সঠিক উপায়ে মেরামত করলে ক্রমান্বয়ে মেরামতযোগ্য সড়কের পরিমাণ ও ব্যয় কমে আসার কথা।
কিন্তু দুই সিটি করপোরেশনের সড়ক মেরামতের চিত্র বলছে, প্রতিবছর মেরামতযোগ্য সড়কের পরিমাণে তেমন হেরফের হচ্ছে না, বরং প্রতিবছরই বরাদ্দ বাড়ছে। গত বছর দুই সিটি করপোরেশন ৫২০ কিলোমিটার সড়ক মেরামত করেছে। চলতি বছর ৫১৯ কিলোমিটার মেরামতের জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে গত অর্থবছরে দুই সিটির সড়ক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা।
এই পরিস্থিতিতে রাজধানীবাসীকে স্বস্তি দিতে এই ভরা বর্ষায়ও কোনো সুখবর নেই। এখন সিটি করপোরেশন বড় বড় গর্তে আস্ত ইট ফেলছে। কিন্তু এতে পরিস্থিতির বদল হচ্ছে না। ইট দিয়ে রাস্তার গর্ত ভরাট, বর্ষার পানি আর চাকার ঘর্ষণে তা আবারও নষ্ট হওয়া—এই চক্রেই দিন পার করতে হচ্ছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বলছে, শুষ্ক মৌসুমে স্থায়ী মেরামতের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। 
মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়ালসড়ক ও মগবাজার-মৌচাক-শান্তিনগর উড়ালসড়কের নিচের সড়ক প্রায় পাঁচ বছর ধরেই বেহাল। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এ দুই উড়ালসড়কের নিচের সড়কের কিছু কিছু স্থানে গর্ত এতটাই গভীর যে নতুন করে নির্মাণ না করলে স্বাভাবিক অবস্থায় আনা যাবে না। মগবাজার উড়ালসড়কের নিচের সড়ক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। ফলে এই সড়ক চালু রাখার বিষয়টি ঠিকাদারের সদিচ্ছার ওপরই ছেড়ে দিয়েছে সিটি করপোরেশন।
ঢাকায় মোটা দাগে মূল সড়ক পাঁচটি। এগুলো হচ্ছে কুড়িল থেকে প্রগতি সরণি হয়ে রামপুরা ও যাত্রাবাড়ী; আবদুল্লাহপুর থেকে মহাখালী ও ফার্মগেট হয়ে প্রেসক্লাব; গাবতলী থেকে আজিমপুর; মহাখালী থেকে মগবাজার হয়ে গুলিস্তান এবং পল্লবী থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত সড়ক। এর মধ্যে আবদুল্লাহপুর থেকে প্রেসক্লাব পর্যন্ত সড়কটিই একটু ভালো। এই পথে রাষ্ট্রীয় অতিথি, ভিভিআইপি ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চলাচল সবচেয়ে বেশি।
রাজধানীর প্রায় সব সড়কই সিটি করপোরেশনের অধীনে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। এর বাইরে বিমানবন্দর সড়কের বনানীর পরের অংশসহ সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের অধীনে থাকা সড়ক ৫০ কিলোমিটারের বেশি নয়। এর মধ্যে গাবতলী-সদরঘাট বেড়িবাঁধের অবস্থা বেশি খারাপ।
এ বছর বর্ষা শুরুর আগে কতটুকু সড়ক বেহাল, তা হিসাব করে দুই সিটি করপোরেশন মেরামতের পরিকল্পনা করে। এতে দেখা গেছে, ৫১৯ কিলোমিটার সড়ক বেহাল, অর্থাৎ মেরামত করতে হবে। এর মধ্যে উত্তরে ২৫০ এবং দক্ষিণে ২৬৯ কিলোমিটার। এ ক্ষেত্রে প্রায় ২২ শতাংশ সড়ক বর্ষার আগে মেরামতের জন্য রাখা হয়েছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই সিটির প্রকৌশল শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, ভারী বৃষ্টিপাত আর জলাবদ্ধতার পর এখন অর্ধেকের বেশি সড়কই বেহাল। এর বাইরে গত শুষ্ক মৌসুমে শুরু হওয়া প্রায় ৫০০ স্থানে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি শেষ না হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
গত দুই দিন প্রথম আলোর দুজন প্রতিবেদক ও তিনজন আলোকচিত্রী উত্তর সিটির গাবতলী, মাজার রোড, দারুস সালাম, আগারগাঁও, মিরপুর ১২ নম্বর, মহাখালী, সাতরাস্তা এবং দক্ষিণ সিটির মিরপুর রোড, রামপুরা, বনশ্রী, বাসাবো, মাদারটেক, মৌচাক মোড় ও মালিবাগ এলাকা ঘুরেছেন। এতে দেখা গেছে, এসব এলাকার দুই-তৃতীয়াংশ সড়কেই গর্ত, ভাঙাচোরা ও খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসব চলছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কুদরত উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, বর্ষা মৌসুমে অনেক সড়কে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বেশি গর্ত হয়েছে এমন সড়কগুলোতে ইট বিছিয়ে চলাচলের উপযোগী রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইট, বালু দিয়ে আপত্কালীন এই সংস্কারকাজ সিটি করপোরেশন নিজস্ব জনবল দিয়ে করছে। শুষ্ক মৌসুমে ভারী মেরামত করা হবে।
প্রায় একই কথা বলেন দক্ষিণের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, অন্যবারের তুলনায় এবার বৃষ্টি বেশি হয়েছে। তাই সড়কে গর্তও বেশি হয়েছে। এখন তাঁরা সাময়িক মেরামতের ওপরই জোর দিচ্ছেন।
রক্ষণাবেক্ষণের গলদের বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তর সিটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কুদরত উল্লাহ বলেন, সিটি করপোরেশন সাধারণত একই সড়ক পরপর দুই বছর সংস্কার করে না। রক্ষণাবেক্ষণ না করলে ঢাকার সড়কে চলাচল করা যেত না। 
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত নতুন সড়ক ঠিকভাবে নির্মাণ করা হলে ১৫-২০ বছর হাত দিতে হয় না। ঢাকার সড়ক যেহেতু পুরোনো, তাই একবার ভারী মেরামত করলে ৬-৮ বছর টিকে থাকার কথা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক আকতার মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, শুধু জলাবদ্ধতার কারণে সড়কের এই অবস্থা হয়েছে, সেটি ঠিক নয়। ভারী যানবাহন চলাচল এবং নিম্নমানের কাজের কারণেও সড়ক ভেঙেছে। বছরের শুরুতেই সিটি করপোরেশনের সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির একটি পথনকশা বা রোডম্যাপ থাকলে এমন হতো না। এ ক্ষেত্রে সময় অনুযায়ী কাজ শুরু ও শেষ করতে হবে এবং অবশ্যই বর্ষা মৌসুমে সড়ক খোঁড়া বন্ধ রাখতে হবে।
সুত্র প্রথম-আলো

চিরকুট: 

মন্তব্য করতে

সাদা-মাটা

  • কোনও HTML ট্যাগ কাজে আসবে না
  • ইন্টারনেট ঠিকানা এবং ইমেইল ঠিকানা সংক্রিয়ভাবে লিঙ্ক এ রুপান্তরিত হবে
  • লাইন এবং অনুচ্ছেদ সংক্রিয়ভাবে
CAPTCHA
This question is for testing whether or not you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.